বুয়েটের সেকেন্ড ইয়ারে থাকাকালীন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে কে পড়াতাম। খুব হাসিখুশি। অনেক ব্রিলিয়ান্ট। এমন এমন সব জোকস করতো আমি অভিনয় করেও গম্ভীর থাকতে পারতাম না। ছেলে টা আমার মন খারাপ ব্যাপার টা কিভাবে যেনো ধরে ফেলতো। এরপর ই সে এমন সব কর্মকান্ড শুরু করতো যে আমার মন ভালো হতে বাধ্য। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, মাস শেষে আমার ই তো এই ছেলেকে বেতন দেয়া উচিৎ।
ছেলে টা মাঝে মাঝে আমাকে ফোনে বলতো, ভাইয়া, আজ আইসেন না। আমি অবাক হতাম। ওর পরীক্ষার আগ দিয়ে একদিন না যেতে বলা সত্ত্বেও আমি গেলাম।
ছেলে টা চুরান্ত অপ্রস্তুত। আমি বসার রুমে বসে আছি। ভেতর থেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ আসছে। আমার নিজের কাছে ই কেমন খারাপ লাগছে। অনেকক্ষন পর ছেলে টা এলো। ওর চোখ টা লাল। মুখ টা থমথমে।
আমার সামনে ও চুপ করে বসে রইলো দশ মিনিট। আমি বললাম, কী হইসে?
ও হঠাৎ আমার হাত টা ধরে ঝরঝর করে কেদে দিলো। আমি এই রকম একটা হাসিখুশি ছেলে কে কাঁদতে দেখে বেশ অবাক ই হলাম। ও বল্লো - "আমার বাবা মাঝে মাঝে ই আমার মা কে পেটায়। সামান্য কারনে পেটায়। কথায় কথায় অশ্রাব্য গালি মারে। আজ সে আমার মা কে বেল্ট দিয়ে মেরেছে।"
যা জানলাম, অবাক করলো। কোনো কিছু পছন্দ সই না হলেই লোকটা তার স্ত্রীর উপর অত্যাচার করে। কথায় কথা থাপ্পড় মারা তার খুব সাধারন কাজ। আর এই সব অত্যাচারে তার লেশ মাত্র অনুশোচনা হয় না। লোক টা একজন শিক্ষিত উচুদরের ব্যবসায়ী।
আমার ছাত্রের মা তার স্বামী কে, সন্তান কে খুব বেশী ভালোবাসে। আমার ছাত্র আমাকে বল্লো, ভাইয়া, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি মা কে নিয়ে চলে যাবো। এই লোক টা আমার বাবা, ভাবতে ইচ্ছা করে না। আমার শরীরে এই লোকের ও যে কিছু রক্ত আছে, মনে হলে মরে যেতে ইচ্ছা করে।
আমি কিছু বললাম না। ওর মা বিশাল ঘোমটা টেনে আমার জন্য নাস্তা নিয়ে এলো। মুখ ভরা মিষ্টি এক টা হাসি কিন্তু চোখ ভরা কষ্ট। উনি হয়তো থাপ্পড়ের দাগ টা আড়াল করার জন্য এতো বড় ঘোমটা টেনেছেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বাবা, আমার ছেলে টা ভালো রেজাল্ট করবে তো?" - কথার মধ্যে যে আর্তি ছিলো, তা আমি ভুলতে পারিনি। একজন অসহায় মানুষ শেষ অবলম্বন খুঁজছিলো সে দিন।
আমি খুব যত্ন করে ওকে পড়াতাম। আমার বাড়ি ওর মোটামুটি কাছে ছিলো। ওকে আমি আমার বাসায় চলে আসতে বলতাম। এক সাথে দুই জন কম্পিউটার গেম খেলতাম। আড্ডা মারতাম, এক সাথে খাওয়া দাওয়া করতাম। চেষ্টা করতাম ওর কষ্ট কিছু টা কমানোর।
ও এইচ,এস,সি তে স্টার সহ দুই লেটার পেলো। যেদিন ওর এই অসাধারন রেজাল্টের আনন্দ, সেই দিন টি তে ওর বাবা ওদের একটা চমৎকার উপহার দিলো। যা কখনো ওরা কল্পনা করতে পারেনি। ওর বাবা মা কে ডিভোর্স দিলো। ওর বাবা নতুন করে নতুন মানুষ নিয়ে জীবন শুরু করবে। এর দুই দিন পর ওর মা নানা বাড়ি চলে গেলো। আমার ছাত্র ঢাকার একটা মেসে থাকতো। ওর বাবা যদিও বলেছিলো ছেলে যেনো তার সাথে থাকে। ও থাকেনি।
আমার ছাত্র কে আমি ই এক টা টিউশনী জোগার করে দিলাম। মাঝে মাঝে ও আমার বাসায় আসতো। ও আমার কাছে এসে ভর্তি পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতো। যখন খুব মন খারাপ হতো মা এর সাথে কথা বলতো। খুব কানতো। আমি আদর করে ওকে বোঝাতাম। ওর মা খুব অসুস্থ ছিলো। বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার দিন আমি ওকে নিয়ে গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার দিন ও গেলাম। পাগল টা পরীক্ষা দেবার আগে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে যেতো।
ও বুয়েটে চান্স পেলো না কিন্তু ঢাকা ভার্সিটির ক ইউনিটে ৩৪ বা ৪৪ তম হলো। ওর এই কৃতিত্বে আমার ই চোখে পানি চলে এলো। আমি ওকে একটা ব্র্যান্ড নিউ ক্যাসিও জি শক গিফট করেছিলাম। (আমার নিজের ও খুব শখ ছিলো, কিন্তু নিজে না কিনে ওকে উপহার দিতে ই আমার আনন্দ বেশী লেগেছিলো)
এই আনন্দের মাত্র তিন মাস পর হুট করে ওর মা মারা গেলো। মহিলা টা জীবনে শুধু কষ্ট ই করেছিলো। তার ছেলের খুব ইচ্ছা ছিলো মাকে জীবনের সব সুখ এনে দেবে, সব আনন্দ গুলো মাকে উপহার দেবে।
আমার ছাত্র আমাকে কান্না চেপে বলেছিলো, "জীবনে শুধু চেয়েছিলাম আমার মায়ের হাসি, মাঝে মাঝে অবাক লাগতো, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে ও আমার মা বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলো। আমার মা ওই লোক টা কে প্রচন্ড ভালোবাসতো। অথচ লোক টা আমার মা কে না খেতে দেবার জন্য রুমে লক করে রাখতো। আর আমার মা কাদতো।"
এক জন মানুষ যখন তার জীবনসঙ্গীকে ভালোবাসতে পারে না, সেটা দুঃখজনক আর তাকে সন্মান দিয়ে না পারলে সেটা অপরাধ। আমার আশেপাশে এরকম হাজার হাজার অপরাধী আছে।
প্রতিনিয়ত আমি দেখি এই রকম মুখোশধারী নিপাট ভদ্র মানুষ গুলো কে। যারা নিজেদের পুরুষত্ব প্রমান করার জন্য, নিজেদের অবস্থান জানান দেবার জন্য হামলে পড়ে তার জীবনসঙ্গীর উপর।
আমাদের আশে পাশে অনেক ছেলে আছে, যারা মেয়েদের সাথে প্রেম করে নিজের স্মার্টনেস, হ্যান্ডসামনেস, অসামনেস প্রমান করার জন্য। খুব সহজেই এক টা মেয়ের মন ভেঙ্গে দিতে ওদের বিন্দু মাত্র অনুশোচনা হয় না, ঝাপিয়ে পড়ে নতুন কোনো মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড বানাতে। আবার ওই ছেলে কে যখন কোনো মেয়ে রিফিউজ করে, সেই মেয়ের সম্পর্কে বাজে কথা বলতে এক মুহুর্ত দেরী করে না। আমি জানি, সবাই এমন না, কিন্তু এই জাতীয় মানুষ দিন দিন বাড়ছে।
আমাদের কাছে আমাদের জীবনসঙ্গীদের, ভালোবাসার মানুষদের প্রত্যাশা খুব বেশী না। মতের মিল না ই থাকতে পারে, পারষ্পারিক সন্মান বোধ টুকু পরিবারের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়লো, স্বামী স্ত্রী একটা ব্রীজ দিয়ে পার হচ্ছে। স্বামী বেচারার খুব ভয় লাগছে। শেষ পর্যন্ত সে তার স্ত্রী কে একটু ঘুরিয়ে বল্লো, "তুমি আমার হাত ধরো, হঠাৎ পড়ে যেতে পারো।" তার স্ত্রী মিষ্টি করে হেসে বল্লো, "আমি তোমার হাত ধরবো না, তুমি আমার হাত ধরো। হঠাৎ সত্যিই যদি আমার কিছু হয়, আমি হয়তো তোমার হাত ছেড়ে ও দিতে পারি, কিন্তু আমি জানি, তুমি আমার হাত কখনো ছাড়বে না"
আমার সেই ছাত্রের মা ও হয়তো এরচেয়ে বেশী কিছু চায় নি। এর পর আমার ছাত্র অনেক যুদ্ধ করে মনবসু স্কলারশীপ নিয়ে জাপান পাড়ি জমালো। বিয়ে করলো। ওর একটা ফুটফুটে বাবু হলো। ও আমাকে ফোন দিয়ে জানালো। সেই কী আনন্দ ওর! আমাকে অনেক কথা বল্লো। শেষে থেমে থেমে বল্লো, "এই পৃথিবীতে আমার বেচে থাকতে ইচ্ছা করতো না। আপনি আমাকে বাচতে শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। এক সময় আমার মা যখন কাদতো, আমার তীব্র যন্ত্রণা হতো, মনে হতো, আল্লাহ নাই। এখন মনে হয় আল্লাহ ই আমাকে রক্ষা করেছেন, এই জন্য ই হয়তো আপনি আমার শিক্ষক। কষ্ট হলো, আমার মা এই আনন্দের সময় আমার কাছে নাই।"
আমি কথা বলতে পারছিলাম না। আমি এই ছেলের জন্য তেমন কী ই বা করেছি? খুব লজ্জা লাগছিলো। আমি বললাম, "তুমি খুব সাহসী ছেলে, আল্লাহ তোমার অনেক ভালো করবে। আর কখনো ভাববে না তোমার মা নেই, উনি তোমাদের মাঝে ই আছেন।" ও কিছুক্ষন চুপ করে হঠাৎ বল্লো, "আপনাকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছি, আমার ছেলে টার ডাক নাম রেখেছি ইমন। যদি আপনার মতো হয়, এই আর কি!" আমি কথা বলতে পারছিলাম না। গলা টা ধরে আসছিলো। আমি অতি কষ্টে শুধু বললাম "আরে গাধা, পুরান আমলের নাম রাখলি! ছেলে তো পরে তোকে গালি দেবে রে!" আমার ছাত্র তৃপ্তির হাসি হাসলো।
মানুষ কে ভালোবাসা অনেক সহজ, কিন্তু এই সহজ কাজ টা করতে আমাদের কষ্ট হয়।
লিখা: সাব্বির ইমন
ছেলে টা মাঝে মাঝে আমাকে ফোনে বলতো, ভাইয়া, আজ আইসেন না। আমি অবাক হতাম। ওর পরীক্ষার আগ দিয়ে একদিন না যেতে বলা সত্ত্বেও আমি গেলাম।
ছেলে টা চুরান্ত অপ্রস্তুত। আমি বসার রুমে বসে আছি। ভেতর থেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ আসছে। আমার নিজের কাছে ই কেমন খারাপ লাগছে। অনেকক্ষন পর ছেলে টা এলো। ওর চোখ টা লাল। মুখ টা থমথমে।
আমার সামনে ও চুপ করে বসে রইলো দশ মিনিট। আমি বললাম, কী হইসে?
ও হঠাৎ আমার হাত টা ধরে ঝরঝর করে কেদে দিলো। আমি এই রকম একটা হাসিখুশি ছেলে কে কাঁদতে দেখে বেশ অবাক ই হলাম। ও বল্লো - "আমার বাবা মাঝে মাঝে ই আমার মা কে পেটায়। সামান্য কারনে পেটায়। কথায় কথায় অশ্রাব্য গালি মারে। আজ সে আমার মা কে বেল্ট দিয়ে মেরেছে।"
যা জানলাম, অবাক করলো। কোনো কিছু পছন্দ সই না হলেই লোকটা তার স্ত্রীর উপর অত্যাচার করে। কথায় কথা থাপ্পড় মারা তার খুব সাধারন কাজ। আর এই সব অত্যাচারে তার লেশ মাত্র অনুশোচনা হয় না। লোক টা একজন শিক্ষিত উচুদরের ব্যবসায়ী।
আমার ছাত্রের মা তার স্বামী কে, সন্তান কে খুব বেশী ভালোবাসে। আমার ছাত্র আমাকে বল্লো, ভাইয়া, আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি মা কে নিয়ে চলে যাবো। এই লোক টা আমার বাবা, ভাবতে ইচ্ছা করে না। আমার শরীরে এই লোকের ও যে কিছু রক্ত আছে, মনে হলে মরে যেতে ইচ্ছা করে।
আমি কিছু বললাম না। ওর মা বিশাল ঘোমটা টেনে আমার জন্য নাস্তা নিয়ে এলো। মুখ ভরা মিষ্টি এক টা হাসি কিন্তু চোখ ভরা কষ্ট। উনি হয়তো থাপ্পড়ের দাগ টা আড়াল করার জন্য এতো বড় ঘোমটা টেনেছেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বাবা, আমার ছেলে টা ভালো রেজাল্ট করবে তো?" - কথার মধ্যে যে আর্তি ছিলো, তা আমি ভুলতে পারিনি। একজন অসহায় মানুষ শেষ অবলম্বন খুঁজছিলো সে দিন।
আমি খুব যত্ন করে ওকে পড়াতাম। আমার বাড়ি ওর মোটামুটি কাছে ছিলো। ওকে আমি আমার বাসায় চলে আসতে বলতাম। এক সাথে দুই জন কম্পিউটার গেম খেলতাম। আড্ডা মারতাম, এক সাথে খাওয়া দাওয়া করতাম। চেষ্টা করতাম ওর কষ্ট কিছু টা কমানোর।
ও এইচ,এস,সি তে স্টার সহ দুই লেটার পেলো। যেদিন ওর এই অসাধারন রেজাল্টের আনন্দ, সেই দিন টি তে ওর বাবা ওদের একটা চমৎকার উপহার দিলো। যা কখনো ওরা কল্পনা করতে পারেনি। ওর বাবা মা কে ডিভোর্স দিলো। ওর বাবা নতুন করে নতুন মানুষ নিয়ে জীবন শুরু করবে। এর দুই দিন পর ওর মা নানা বাড়ি চলে গেলো। আমার ছাত্র ঢাকার একটা মেসে থাকতো। ওর বাবা যদিও বলেছিলো ছেলে যেনো তার সাথে থাকে। ও থাকেনি।
আমার ছাত্র কে আমি ই এক টা টিউশনী জোগার করে দিলাম। মাঝে মাঝে ও আমার বাসায় আসতো। ও আমার কাছে এসে ভর্তি পরীক্ষার প্রিপারেশন নিতো। যখন খুব মন খারাপ হতো মা এর সাথে কথা বলতো। খুব কানতো। আমি আদর করে ওকে বোঝাতাম। ওর মা খুব অসুস্থ ছিলো। বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার দিন আমি ওকে নিয়ে গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার দিন ও গেলাম। পাগল টা পরীক্ষা দেবার আগে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে যেতো।
ও বুয়েটে চান্স পেলো না কিন্তু ঢাকা ভার্সিটির ক ইউনিটে ৩৪ বা ৪৪ তম হলো। ওর এই কৃতিত্বে আমার ই চোখে পানি চলে এলো। আমি ওকে একটা ব্র্যান্ড নিউ ক্যাসিও জি শক গিফট করেছিলাম। (আমার নিজের ও খুব শখ ছিলো, কিন্তু নিজে না কিনে ওকে উপহার দিতে ই আমার আনন্দ বেশী লেগেছিলো)
এই আনন্দের মাত্র তিন মাস পর হুট করে ওর মা মারা গেলো। মহিলা টা জীবনে শুধু কষ্ট ই করেছিলো। তার ছেলের খুব ইচ্ছা ছিলো মাকে জীবনের সব সুখ এনে দেবে, সব আনন্দ গুলো মাকে উপহার দেবে।
আমার ছাত্র আমাকে কান্না চেপে বলেছিলো, "জীবনে শুধু চেয়েছিলাম আমার মায়ের হাসি, মাঝে মাঝে অবাক লাগতো, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে ও আমার মা বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলো। আমার মা ওই লোক টা কে প্রচন্ড ভালোবাসতো। অথচ লোক টা আমার মা কে না খেতে দেবার জন্য রুমে লক করে রাখতো। আর আমার মা কাদতো।"
এক জন মানুষ যখন তার জীবনসঙ্গীকে ভালোবাসতে পারে না, সেটা দুঃখজনক আর তাকে সন্মান দিয়ে না পারলে সেটা অপরাধ। আমার আশেপাশে এরকম হাজার হাজার অপরাধী আছে।
প্রতিনিয়ত আমি দেখি এই রকম মুখোশধারী নিপাট ভদ্র মানুষ গুলো কে। যারা নিজেদের পুরুষত্ব প্রমান করার জন্য, নিজেদের অবস্থান জানান দেবার জন্য হামলে পড়ে তার জীবনসঙ্গীর উপর।
আমাদের আশে পাশে অনেক ছেলে আছে, যারা মেয়েদের সাথে প্রেম করে নিজের স্মার্টনেস, হ্যান্ডসামনেস, অসামনেস প্রমান করার জন্য। খুব সহজেই এক টা মেয়ের মন ভেঙ্গে দিতে ওদের বিন্দু মাত্র অনুশোচনা হয় না, ঝাপিয়ে পড়ে নতুন কোনো মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড বানাতে। আবার ওই ছেলে কে যখন কোনো মেয়ে রিফিউজ করে, সেই মেয়ের সম্পর্কে বাজে কথা বলতে এক মুহুর্ত দেরী করে না। আমি জানি, সবাই এমন না, কিন্তু এই জাতীয় মানুষ দিন দিন বাড়ছে।
আমাদের কাছে আমাদের জীবনসঙ্গীদের, ভালোবাসার মানুষদের প্রত্যাশা খুব বেশী না। মতের মিল না ই থাকতে পারে, পারষ্পারিক সন্মান বোধ টুকু পরিবারের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়লো, স্বামী স্ত্রী একটা ব্রীজ দিয়ে পার হচ্ছে। স্বামী বেচারার খুব ভয় লাগছে। শেষ পর্যন্ত সে তার স্ত্রী কে একটু ঘুরিয়ে বল্লো, "তুমি আমার হাত ধরো, হঠাৎ পড়ে যেতে পারো।" তার স্ত্রী মিষ্টি করে হেসে বল্লো, "আমি তোমার হাত ধরবো না, তুমি আমার হাত ধরো। হঠাৎ সত্যিই যদি আমার কিছু হয়, আমি হয়তো তোমার হাত ছেড়ে ও দিতে পারি, কিন্তু আমি জানি, তুমি আমার হাত কখনো ছাড়বে না"
আমার সেই ছাত্রের মা ও হয়তো এরচেয়ে বেশী কিছু চায় নি। এর পর আমার ছাত্র অনেক যুদ্ধ করে মনবসু স্কলারশীপ নিয়ে জাপান পাড়ি জমালো। বিয়ে করলো। ওর একটা ফুটফুটে বাবু হলো। ও আমাকে ফোন দিয়ে জানালো। সেই কী আনন্দ ওর! আমাকে অনেক কথা বল্লো। শেষে থেমে থেমে বল্লো, "এই পৃথিবীতে আমার বেচে থাকতে ইচ্ছা করতো না। আপনি আমাকে বাচতে শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। এক সময় আমার মা যখন কাদতো, আমার তীব্র যন্ত্রণা হতো, মনে হতো, আল্লাহ নাই। এখন মনে হয় আল্লাহ ই আমাকে রক্ষা করেছেন, এই জন্য ই হয়তো আপনি আমার শিক্ষক। কষ্ট হলো, আমার মা এই আনন্দের সময় আমার কাছে নাই।"
আমি কথা বলতে পারছিলাম না। আমি এই ছেলের জন্য তেমন কী ই বা করেছি? খুব লজ্জা লাগছিলো। আমি বললাম, "তুমি খুব সাহসী ছেলে, আল্লাহ তোমার অনেক ভালো করবে। আর কখনো ভাববে না তোমার মা নেই, উনি তোমাদের মাঝে ই আছেন।" ও কিছুক্ষন চুপ করে হঠাৎ বল্লো, "আপনাকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছি, আমার ছেলে টার ডাক নাম রেখেছি ইমন। যদি আপনার মতো হয়, এই আর কি!" আমি কথা বলতে পারছিলাম না। গলা টা ধরে আসছিলো। আমি অতি কষ্টে শুধু বললাম "আরে গাধা, পুরান আমলের নাম রাখলি! ছেলে তো পরে তোকে গালি দেবে রে!" আমার ছাত্র তৃপ্তির হাসি হাসলো।
মানুষ কে ভালোবাসা অনেক সহজ, কিন্তু এই সহজ কাজ টা করতে আমাদের কষ্ট হয়।
লিখা: সাব্বির ইমন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন