ক্রিকেট এখন ন্যাশনালিজমের সিম্বল

নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন, “হাইস্কুলে পড়ার সময় মনে হয়েছে, এই যে হাইস্কুল টিমকে আমি সাপোর্ট করছি, কেন? আমি তো এই টিমের কাউকেই চিনি না, অথচ ঠিকই চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেলছি। হোয়াই ডু আই কেয়ার? চমস্কি বলছেন, এই সাপোর্টের মধ্য দিয়ে এক ধরনের “ইর‍্যাশনাল রিলেশনশীপ” (অযৌক্তিক সম্পর্ক) এর জন্ম হয়, যা মূলত আমাদেরকে কর্তৃত্বপরায়ণবাদীতার কাছে আত্মসমর্পণ শিখায়, অথোরিটেরিয়ানের (স্বৈরাচারী) অনুগত করে। 

চমস্কি আরো বলছেন, দেখবেন সবাই খেলা নিয়ে কেমন এক্সপার্ট মত দিচ্ছে। কী করতে হবে বয়ান দিচ্ছে। এমনকি এক্সপার্টদের সাথে বিতর্ক কছে। তার মানে, তারা খেলা নিয়ে ভাবে। গভীরভাবে চিন্তা করে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়েও এনালাইসিস দাঁড় করায়। 

কিন্তু তারা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মোটেও আগ্রহী না, যদিও সেটা তাদের জীবনযাত্রাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ, এই খেলা নিয়ে মেতে থাকাটা পলিটিক্যালি কারেক্ট (রাজনৈতিকভাবে নির্ভূল)। নির্ভেজাল এবং নির্ঝঞ্ঝাট বিনোদন। কিন্তু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণগুলো এই রকমের নির্বিষ না। 

এগুলা নিয়ে চিন্তা করলে তাই “চাকরি থাকবে না”। চমস্কি তাই বলছেন, বিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা এই স্পোর্টস ন্যাশনালিজমের (খেলাধুলা কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ) ভয়াবহ প্রসার এবং ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট (উক্ত বিশেষ জাতীয়োটাবাদ প্রসারের লক্ষে সমমনা সকলের ঐকমত্য) দেখে একে প্রপাগ্যান্ডিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার (রাষ্ট্রের সিস্টেমটা যখন নিজের করে আসা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাফাই গাওয়াটাই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়) নতুন আবিষ্কার মনে করলেও এইটা আসলে ফ্যাসিবাদের (১ম বিশ্বযুদ্ধের পরে ইটালিতে প্রসার লাভ করা উগ্র জাতীয়তাবাদ) আদি ও আসল লাইন। 

এ কারণেই গ্ল্যাডিয়েটরদের ফাইটের (প্রাচীন রোমের যোদ্ধা; যাদের কাজ ছিল অন্য মানুষ কিংবা পশুর সাথে যুদ্ধ করে নিজের বীরত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া) সময় স্টেডিয়ামের উচ্ছ্বাস আর ইয়াংকি স্টেডিয়ামে বেসবল খেলার উচ্ছ্বাসে কোন পার্থক্য নেই। কারণ এই উচ্ছ্বাসগুলার আড়ালে কর্পোরেট জুলুম, দুর্নীতি, দুঃশাসন, গুম, খুন - সব চাপা পড়ে যায়। কারোরই আর রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলার সাহস থাকে না বা মনে থাকে না। 

চমস্কির এই আলাপের সূত্র ধরে ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েরর আরেক প্রফেসর বলছিলেন, এই যে কার ব্যাটিং গড় কত, হিটিং রেট কত এ নিয়ে যতটা চিন্তিত, তারা কি আমেরিকার ভোটিং সিস্টেম (নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং এর খুটিনাটি যা কিছু আছে) নিয়ে আদৌ চিন্তিত? কিংবা যারা ১০০০ ডলার দিয়ে টিকেট কিনে খেলা দেখে তারা কি আদৌ সোশ্যাল চ্যারিটি কিংবা স্কুল ফান্ডে এক হাজার ডলার দিবে? 

ভদ্রলোক বলছিলেন, মার্ক্স ধর্মকে আফিম বলেছেন তবুও ধর্ম মানুষকে সওয়াবের (পূণ্যকাজের উপকারিতা এবং উপযোগিতা) কথা বলে চ্যারিটি শিখায়। কিন্তু স্পোর্টস তারচেয়েও বড় আফিম। এইখানে চ্যারিটিও শেখানো হয় না। আর জর্জ অরওয়েল তো বলেই দিয়েছেন, প্রীতি ম্যাচে আদতে কোন প্রীতি থাকে না। এইটা একটি জাতীয়তাবাদী যুদ্ধই। অন্য ফ্রন্টে, অন্য ফরম্যাটে। খেলোয়াড় এবং সাপোর্টারদের শরীরী ভাষা দেখলেই ব্যাপারটা খোলাসা হয়। 

আশিস নন্দীও এই স্পোর্টস নিয়ে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মধ্যে নিছক পুঁজিবাদের জয়জয়কারকেই দেখছেন। তো, এই যে মানুষ এতো খুশি হচ্ছে, এই খুশি নিয়ে জিজেক বলছেন, স্টুপিডদের হ্যাপী দেখলে আমার সবচেয়ে বেশি রাগ লাগে। তার মানে আপনারা সব গোমড়া হয়ে বসে থাকবেন, খেলা দেখবেন না, ব্যাপারটা তা না। 

যখন আপনি অন্য দেশের খেলা দেখছেন, তখন হয়ত শুধুই খেলা। নিছক বিনোদন। কিন্তু যখন নিজের দেশের খেলা দেখছেন, তখন আপনার আশেপাশের লোকজনের শরীরী ভাষা দেখে আপনি নিজেই বুঝছেন, খেলাটা আর নিছক বিনোদনের জন্য খেলার জায়গায় নেই, তখন আপনি মন চাইলে ঘরে বসে চুপচাপ খেলা দেখেন, তবে এই স্টুপিড ক্রাউডকে (নির্বোধ মানুষ যাদের এই বোধ নেই যে - দিনশেষে কোনটা তাদের জন্য কল্যাণকর আর কোনটা অকল্যাণকর) কন্ট্রিবিউট করবেন না দয়া করে। 

ক্রিকেট এখন ন্যাশনালিজমের সিম্বল (জাতীয়তাবাদের প্রতীক)। চমস্কি একে বলছেন জিংগোপনা, উগ্র দেশাত্মবোধ- যেই পয়েন্টে এসে দেশপ্রেম আর জিংগোপনা মিংগেল (মিলিত হয়ে) করে এক হইয়া যায়। আর ঠিক তখনই এইটা হইয়া উঠে আসাবিয়্যাহ (জাতীয়তাবাদ)। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই আসাবিয়্যাহকে বলেছেন নিজের বাবার লজ্জাস্থান কামড়ে পড়ে থাকা। 

(সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি