জাতীয় উন্নয়ন : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

উন্নয়নের একটি গ্রহণীয় সংজ্ঞা নির্ধারণ খুবই কঠিন। এটা আজ পর্যন্ত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এক এক তাত্ত্বিক এক এক ধরনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেমন, অর্থনীতিবিদরা সব সময়ই উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যে অর্থনীতিকে টেনে এনেছেন। সমাজবিজ্ঞানীরা উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যে সমাজের উন্নয়নকে জোর দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানীরা উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যে মানুষের মন-মানসিকতার উন্নয়নকে জোর দিয়েছেন। প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীরা উন্নয়নের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের ওপর জোর দিয়েছেন। নৃ-বিজ্ঞানীরা উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যে সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে দেখা যায়, কেউই উন্নয়নের সর্বজনীন ও গ্রহণীয় সংজ্ঞা দিতে পারেননি। প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট সমাজ বা দেশের প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের সংজ্ঞা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এখন দেখা যাক বিভিন্ন তাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নের অতীত ও বর্তমানের সংজ্ঞা, যা উন্নয়নের গ্রহণীয় সংজ্ঞা সম্পর্কিত ধারণাকে আরো ত্বরান্বিত করবে।


তবে আজকের এই লেখায় আমি অর্থনীতিবিদদের চোখে জাতীয় উন্নয়ন যেমন ঠিক তেমনটা তুলে ধরার চেষ্টা করব। জাতীয় উন্নয়নের এই ব্যাপারগুলো নিয়ে পুঙ্খানপুঙ্খ আলোচনা করে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদেরা। সৌভাগ্যক্রমে বিশ্বের প্রথম সারির একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের সাহচর্য পেয়েছি আমি। আমাদের প্রজন্ম বুঝে জাতীয় উন্নয়ন মানেই হল একটা দেশের জিডিপি (Gross Domestic Product), জিএনপি (Gross National Product) এর মান যত বেশি। আক্ষেপ হল, জাতীয় উন্নয়ন শুধু একয়টা সূচক দিয়ে নিরুপণ করা যায় না। আরও কিছু প্রভাবক একটা জাতির উন্নয়নে প্রভাবিত করে। তো সবার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন, এই উন্নয়ন বিষয়টা কী! উন্নয়ন হলো কোনো দেশ বা সমাজে যদি মুক্ত অর্থনীতির কাঠামো বিরাজমান থাকে তবেই ওই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। তার মানে হল, এ অবস্থা সমাজ বা দেশে বিরাজমান থাকলে ব্যক্তিস্বার্থ উন্নয়নে সবাই আগ্রহী হবেন। আর এ জন্য সমষ্টিগত স্বার্থের উন্নয়ন তথা জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব হয়ে উঠবে।   


কঠিন হয়ে গেল নাকি কথাগুলো? আচ্ছা, ভেঙ্গে বলছি। ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ হলো উন্নতি হতে যাচ্ছে এমন অর্থাৎ উন্নয়ন হলো পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া, যা বস্তুগত ও মানসিক উভয় ব্যাপার। কোনো সমাজ বা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিক, চিন্তাগত ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ইত্যাদির পরিবর্তন (উন্নতি) হওয়াই হলো উন্নয়ন তথা জাতীয় উন্নয়ন। এসব বিষয়ের সুসংগঠিত কাঠামো গঠনপূর্বক উৎপাদনমুখী প্রযুক্তি ব্যবহার, শ্রম, মেধা ও পুঁজির সঠিক প্রয়োগসংবলিত ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত সুফল সমাজ বা দেশের জনগণের চিন্তাচেতনায় যৌক্তিকভাবে নিবেদন করলে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক যে উন্নতি সাধন হয় তা-ই হলো জাতীয় উন্নয়ন।


অনেকেই বিশ্বাস করেন সুশাসন একাই জাতীয় উন্নয়ন ঘটিয়ে দিবে। আসলে উন্নয়নের সংজ্ঞা তারা জানে না বলেই এসব বলে। সুপ্রিয় পাঠকেরা সবসময় মনে রাখবেন, আমরা, জনগণরাই হলাম একটা দেশের মূল চালিকাশক্তি। সরকার সবসময়ই আমাদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। আর জনগণ সেখানে বিনিয়োগ করে; জাতীয় উন্নয়নে সহায়তা করে। এখন জনগণ যদি বিনিয়োগ না করে সেক্ষেত্রে সরকার তাদের বাধ্য করবে। যদি না করতে পারে তাহলে বুঝতে হবে সেটা সুশাসনের ব্যর্থতা।  একটা বাস্তব উদাহরণ দিই কেমন? ‘ধরুন, কামাল একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তার পরিবারে মা, বাবা, ছোট এক ভাই ও বোন আছে। তার বাবা কষ্ট করে রুজিরোজগার করে সংসার চালাচ্ছে, ছোট ভাই বোন দুটোকে পড়ালেখা করিয়েছে। ছোট ভাইটিকে দেশের বাইরেও পাঠিয়েছে উপার্জনের জন্য। ছোট ভাইটি বিদেশ স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। কামাল এসব দেখেই সন্তুষ্ট; সে তার কাছ থেকে অর্থকড়ি আশা করে না। এমতাবস্থায় কামালের বাবা অবসরে গেছেন। কামালকেই এখন সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। টানাটানি অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের অবস্থা দেখে যদি সেই ছোট ছেলেটি নির্দ্বিধায় টাকা পাঠায় তাহলে তো খুবই ভালো। যদি না পাঠায় কামালের বাবাকে তার ছোট ছেলের কাছে এবার অর্থ পাঠানোর জন্য বাধ্য করা লাগবে।’ এখানে সরকার হলেন কামালের বাবা আর সেই ছোট ভাই হল আমরা তথা জনগণ। জনগণকে নিজ নিজ উদ্যোগে জাতীয় উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে; আর যদি না করি সরকারকে আমাদের বাধ্য করা লাগবে তাহলে বুঝতে হবে সুশাসনেই (Good Governance) সমস্যা রয়েছে। সরকার ক্ষেত্র প্রস্তুতের সাথে সাথে উপার্জনের উৎপাদনশীলতা (Income Productivity) বাড়াবে আর উপার্জন বাড়াতে গিয়ে জাতীয় উন্নয়নের যেন ক্ষতি না হয় সেটাও দেখবে। তবে মাঝেমধ্যে আমরা না চাইলেও জাতীয় উন্নয়ন সাধন করতে গিয়ে সুশাসন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সেদিকে যাচ্ছি না। 

(চলবে) 

#উন্নয়নঅর্থনীতি #জাতীয়উন্নয়ন    

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি