ইসলামপূর্ব সময়ে আরবদের মাঝে অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন হাতিম তাঈ (মৃত্যু ৬০৫ সাল)। সবাই তার দানদক্ষিণার খবর জানতেন। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন আরবদের মাপকাঠি। তিনি গরিবদের খাবার দিতেন। আজনবিদের আশ্রয় দিতেন। তিনি শত্রুদের প্রতি দয়াপরবশ ছিলেন। মানুষের কাছে তিনি এত বেশি বিখ্যাত ছিলেন যে, আজও আরবরা তাকে ‘দাতা হাতিম তাঈ’ নামে চেনে।

তার ছেলে ‘আদি বিন হাতিম ইসলাম বরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ এক সাহাবি। একদিন নবিজির ﷺ কাছে তিনি তার বাবার ব্যাপারে শুধালেন, “আল্লাহর রাসূল, আমার বাবা আত্মীয়স্বজনদের সাথে সদাচরণ করতেন, গরিবদের খাওয়াতেন, তিনি অমুকটা করতেন, তমুকটা করতেন...” এভাবে তিনি তার বাবার অনেক অনেক ভালো কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে বললেন, “...তিনি কি এগুলোর জন্য পুরস্কার পাবেন?”

আল্লাহর রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, “‘আদি, তোমার বাবা কিছু একটা চেয়েছিলেন [মানে খ্যাতি], তিনি সেটা পেয়েছেন।” [আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেছেন এটি]

যতবার কোনো বিখ্যাত লোক মারা যান, ঘুরেফিরে মুসলিমদের মাঝে এই একই প্রশ্ন আর মনোভাব ঘুরপাক খেতে থাকে। অথচ এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেওয়া আছে আমাদের কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যে।




একজন মানুষ কোনো একটি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করতেই পারেন। আবার অন্য একটি বিষয়ে তিনি হতে পারেন শিশু। পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রতিভা মুসলিমরা যেখানেই পান না কেন, তার প্রশংসা করতে পারে, সেখান থেকে নিজেদের উপকৃত করতে পারে। কিন্তু কারও মেধা ও প্রতিভা যদি তাকে আধ্যাত্মিকভাবে কোনো কল্যাণ করতে না পারে সেটা তা হলে চূড়ান্ত ক্ষতি।

এক দার্শনিকের সমালোচনায় ইবনু তায়মিয়্যা লিখেছিলেন, “তাদেরকে মেধা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু শুদ্ধতা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।”

ইসলামকে বিদ্রুপকারী এক মেধাবী মানুষের জীবনীতে যাহাবি লিখেছেন, “মেধা থাকার পরও যার মধ্যে ঈমান নেই, আল্লাহ তাকে অভিশাপ দেন। অন্যদিকে অতিসাধারণ কারও যদি ঈমান থাকে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।”

আধুনিক সময়ে ‘মেধা’ হয়ে উঠেছে ভালো মানুষ নির্ণয়ের মাপকাঠি। স্রেফ কারও বুদ্ধিবৃত্তি দেখে মানুষ তাকে ন্যায়পর হিসেবে সনদ দেয়। অথচ এই মেধা তো কেবল মানুষের চোখ আর কানের মতো হাতিয়ার। চোখের মালিক তার চোখ দিয়ে যদি আশেপাশে না-ই দেখেন, তা হলে এ চোখের কী দাম?

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান কারও মেধা যদি তাকে এই মেধার স্রষ্টার সমানে বিনয়ী করতে না পারে, তাঁকে চেনাতে না পারে, তা হলে এর ব্যবহারের স্বার্থকতা কোথায়?

স্টিফেন হকিং কিছু একটা চেয়েছিলেন, তিনি সেটা পেয়েছেন।

পুনশ্চ: একটা জিনিস আমাকে খুব অবাক করে। অনেক মুসলিম, এবং যাদের জ্ঞান আছে বলে ধারণা করা হয়, তারা এ ধারার যেকোনো অভিনয়শিল্পী, তারকা ও বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতে দু‘আ করে। এদের জন্য দু‘আ করার ব্যাপারে কুরআন, হাদীস এবং পূর্ববর্তী বিদ্বানদের নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট কথাকে বাদ দিয়ে সহজ একটা প্রশ্ন করি: এ ধরনের মানুষেরা আল্লাহকে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর থেকে কোনো ধরনের পুরস্কারও কামনা করেননি কখনো। জীবিত অবস্থায় যারা নিজেরা যেখানে তাদের জন্য এ ধরনের ইচ্ছা পোষণ করেননি, সেখানে অন্যরা কেন তাদের মৃত্যুর পর এ ধরনের দু‘আ করবে?

ড. ইয়াসির ক়াদ়ি
ডিন, আল-মাগরিব ইন্সটিটিউট
অধ্যাপক, রোডস কলেজ, মেম্ফিস, টেনিসি

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি