ব্লকচেইনের খুঁটিনাটি
অনেক অনেক বছর আগে মানুষ যার যেটা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী জিনিসপত্র লেনদেন করত। সেখানে সমস্যা হল, ধরা যাক সবজি চাষি রহিম মিয়ার এক বস্তা চাল লাগবে, বিনিময়ে সে এক ঝুড়ি সবজি দেবে। করিম মিয়ার কাছে বিনিময়যোগ্য এক বস্তা চাল আছে, কিন্তু সবজি তার প্রয়োজন নেই। তাহলে এখানে বিনিময় হতে পারছেনা।
এভাবে সবাই ভেবে দেখলো, একটা এমন কিছু দরকার সকলের কাছে যার মূল্য আছে যেমন, সোনা। এভাবে সেই অনেক বছর আগে থেকে এখনো সোনাকে সম্পদ পরিমাপের একটা একক হিসাবে ধরা যায়। আগে সরাসরি সোনা লেনদেন হত, সেটা একসময় মানুষের প্রয়োজনমত কাগজের মুদ্রা ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এভাবে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা যেমন, টাকা, ডলার, পাউণ্ড, ইউরো ইত্যাদি এসেছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রা ছেপে বাজারে ছাড়তে পারে মানুষের ব্যবহারের জন্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ আদান প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেশের আইন অনুযায়ী সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম। আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি সেই সাপেক্ষে ব্যাংকের ভূমিকা সেটা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করি।
ধরা যাক, কালাম সাহেব যে কোন একটা কাজের জন্য বালাম সাহেবকে একটা টাকা পাঠাবেন। কিন্তু সমস্যা হল, বালাম সাহেবের লেনদেন করার সুনাম খুব ভালো না। কালাম সাহেব জানেন, ক্যাশ লেনদেন করলে সেখানে আসলে লেনদেন হয়েছে সেটা প্রমাণ করা সমস্যা হতে পারে। হয়তো বালাম সাহেব টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করতে পারেন। উপায় কি? একটা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান লাগবে যাদের কাজ হল, এই লেনদেনকে লেজিটিমেট করা। অর্থাৎ কালাম সাহেবের অ্যাকাউন্টের টাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বালাম সাহেবের অ্যাকাউন্টে যাবে, এবং প্রতিষ্ঠানটি সেই লেনদেনের রেকর্ড রাখবে যাতে এই লেনদেন নিয়ে দুইজনের কেউ কোন প্রশ্ন না তুলতে পারে। এই মাঝখানের প্রতিষ্ঠানটি হল ব্যাংক।
এখন, কেমন হত যদি, কালাম সাহেব কোন তৃতীয় পক্ষ বা ব্যাংকের কাছে না গিয়ে যদি কোন উপায়ে সরাসরি বালাম সাহেবকে টাকাটা পাঠাতে পারতেন ? এখানে আমরা এমন একটা সিস্টেম এর কথা ভাবছি যেখানে, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ বা আর্থিক মূল্য আছে এমন যে কোন সম্পদের সরাসরি লেনদেন হবে এবং কোন প্রকার হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা পরিবর্তন সোজা কোথায় কোন প্রকার দুই নাম্বারি যে সিস্টেমে প্রায় অসম্ভব।
তো এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসাবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এই প্রযুক্তির পেছনে। ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো। 'যিনি' কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, অনুমান করা হয় সাতোশি নাকামোতো হচ্ছে একদল হ্যাকারের কোডনেম যাদের আসল পরিচয় অজানা।
ব্লকচেইন কী?
প্রথমেই এই টার্মটির দিকে একটু ভালো করে খেয়াল করুণ। তাহলেই একটি বেসিক ধারণা পাবেন যে এই নামটি দিয়ে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। ব্লকচেইন মানে বলা হচ্ছে ব্লক দিয়ে তৈরি চেইন বা ব্লকের চেইন। চেইন কি তা আমরা সবাই জানি। অনেকগুলো একই ম্যাটেরিয়াল পাশাপাশি একটির সাথে আরেকটি যোগ করার মাধ্যমে সেগুলোকে একটি শিকলের মত করাকেই চেইন বলা হয়। তাহলে ভেবে দেখুন, অনেকগুলো ব্লককে একটির সাথে আরেকটি জোড়া দেওয়ার মাধ্যমে ব্লকের একটি শিকল তৈরি করাকেই বোঝানো হচ্ছে ব্লকচেইন টার্মটির দ্বারা। আচ্ছা, আর যে ব্লকগুলোর দ্বারা এই চেইনটি তৈরি করা হয় সেই ব্লকগুলো মূলত ইনফরমেশন স্টোর করে। ব্লকচেইন টেকনোলজিটি অনেক আগে থেকেই আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাবহারও হয়ে আসছে। কিন্তু সাধারন মানুষের এই টেকনোলজিটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় মূলত ২০০৯ সালে বিটকয়েন নামের ক্রিপটোকারেন্সিটি উদ্ভাবন হওয়ার পরে। টেকনিক্যালি বলতে হলে ব্লকচেইন হচ্ছে একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার, যেটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। ব্লকচেইনের ব্লকগুলোর মধ্যে যখন একটি ডেটা ইন্টার করা হয়, তখন ওই ডেটাটিকে ডিলিট করা বা ডেটাটির কোন ধরনের পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।
ব্লকচেইন হল একটি মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে যত আর্থিক বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেই লেনদেনের সকল এনক্রিপটেড তথ্য একসাথে নিয়ে একটা ব্লক বানিয়ে সেই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সাজানো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড এবং ডিসেন্ট্রালাইজড লেজার। ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের খাতা থাকে। এটা দেখতে ইচ্ছা হলে সরকারি ব্যাংকে গেলে সবচেয়ে ভালো হয়। আর যে ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তাদের এই রেকর্ড থাকে ডেটাবেইজে। হয়তো, সেই পুরানো খাতাতেও থাকে। এই বড় সাইজের খাতাটাকে বলে লেজার। একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের লেজারে সেটার এন্ট্রি থাকতে হবে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা এরকম অনেকগুলো ব্লক থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন